শিলং ভ্রমণ গাইড বিস্তারিত খরচ ও অন্যান্য তথ্য

Last updated on August 1st, 2018 at 03:14 am

ভারতের মেঘালয়ের শিলং, চেরাপুঞ্জি, ডাউকি ঘুরতে যেতে চাচ্ছেন আপনি, তাইনা? আমি এই মে মাসে ঘুরে এলাম মেঘালয় থেকে। আমি এই ব্লগে আপনাদের আমার ভ্রমন অভিজ্ঞতা থেকে বিস্তারিত জানাতে চেষ্টা করব। এর মাঝে থাকবে সকল তথ্য যেমন, কি কি লাগবে, খরচ কেমন, কিভাবে যেতে হবে, থাকবেন কোথায়, খাবেন কি, শপিং ইত্যাদিসহ আরো আনুষঙ্গিক বিষয়। আমি এখানে শিলং কি, এর আয়তন, লোকজন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট করব না। কারণ এগুলো তো আপনি উইকি থেকেই জেনে পারবেন। তাহলে চলুন জেনে নিই বিস্তারিত।

বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার শখ আমাদের সবার থাকে, তাইনা? কম খরচে বিদেশ ভ্রমণের জন্য আমাদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হচ্ছে ভারত ভ্রমণ। সব ট্যুর করার জন্য সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে ইচ্ছে আর সময়। আর আপনি যেহেতু এই গাইডটি পড়ছেন তাহলে আমি ধরে নিচ্ছি আপনার ইচ্ছে আর সময় দুটোই আছে। 🙂 আর খরচ অনেকটা হাতের মুঠোয়ই বলা যায়। মেঘালয় রাজ্য হচ্ছে আমাদের সীমান্তবর্তী রাজ্য তাই এতে যাতায়াত খরচ ভারতের অন্যান্য রাজ্যে যাওয়ার চেয়ে কম।

মাত্র ১০-১২ হাজার টাকায় ভালভাবে ঘুরে আসতে পারবেন মেঘালয়।



মেঘালয় ভ্রমণ গাইডে আমি দুটি ভাগে সব বিষয় আলোচনা করব। একটা হচ্ছে পার্ট-১ (পূর্বপ্রস্তুতি) যা দেশে থেকেই করতে হবে। যেমন পাসপোর্ট, ভিসা, টাকা/ডলার, ভ্রমণসঙ্গী, পোষাক ইত্যাদি। আর একটা হচ্ছে পার্ট-২ (ভ্রমণপর্ব) । এখানে থাকবে যাতায়াত, বর্ডার ইমিগ্রেশন, হোটেল, খাবার, দর্শনীয় স্থান, শপিং, ইন্টারনেট ইত্যাদি। আর সব ভাগেই খরচের আইডিয়া দেয়ার চেষ্টা করব আপনাদের সুবিধার্থে।

পার্ট-১ (পূর্বপ্রস্তুতি)

আপনি মেঘালয় ভ্রমণ করবেন বলে ঠিক করেছেন। এখন আপনাকে মেঘালয়ের জন্য রওনা হওয়ার আগে কিছু কিছু জিনিস নিশ্চিত করতে হবে। চলুন জেনে নিই এই ট্যুরের জন্য কি কি লাগবে। আর এগুলো শুধু মেঘালয় ভ্রমণ নয় মোটামুটি সব দেশে ভ্রমণের জন্যই প্রযোজ্য

  • পাসপোর্ট ও ভিসা
  • ভ্রমণ কর
  • টাকা/ডলার
  • ভ্রমনের উপযুক্ত সময়
  • ভ্রমণসঙ্গী
  • পোষাক
  • অন্যান্য

পাসপোর্ট ও ভিসা

বিদেশ ভ্রমনের জন্য আপনার একটি পাসপোর্ট ও সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা থাকা আবশ্যক। তাই আপনার যদি পাসপোর্ট না থাকে তাহলে পাসপোর্ট করে নিন। আর ইন্ডিয়ান ভিসা কিভাবে পাবেন তার বিস্তারিত দেখুন আমার এই ব্লগে ভারতীয় ভিসা আবেদনের বিস্তারিত নিয়ম

শিলং/মেঘালয় সিলেট দিয়ে যেতে চাইলে ভিসা এপ্লিকেশনের পোর্ট অব এন্ট্রি-এক্সিট অবশ্যই ‘BY ROAD DAWKI’ সিলেক্ট করবেন।

 

ভ্রমণ কর/ট্রাভেল ট্যাক্স

বাংলাদেশ থেকে বিদেশ ভ্রমণ করলে সরকারকে ভ্রমণ কর বা ট্রাভেল ট্যাক্স দিতে হয়। স্থলপথে ভ্রমণ করের পরিমাণ ৫০০ টাকা যা আগে থেকেই বা বর্ডারে সোনালি ব্যাংকের বুথে জমা দিতে হয়। আমার মতে বর্ডারে সময় ও ঝামেলা এড়াতে যাত্রা শুরুর আগেই ভ্রমণ কর দিয়ে দেয়া উচিৎ। ডাউকিতে ভ্রমণ কর নেয়ার কোন সিস্টেম নেই। এখানে আগে কর দিয়ে না গেলে ঝামেলা হয় আর শেষ ব্যবস্থা হিসেবে ১০০-৩০০ টাকা বেশি দিলে ওরা ব্যাবস্থা করে দেয়। ভ্রমণ কর সম্পর্কের আরো বিস্তারিত জানতে পড়ুন

ভ্রমণ কর বা ট্রাভেল ট্যাক্স কি ও কোথায়, কিভাবে দিব?

টাকা/ডলার

টাকা! ঘুরতে গেলে টাকা তো লাগবেই তা তো সবারই জানা। টাকা না লাগলে কতই না ভাল হত তাইনা? সব দেশ ঘুরতে পারতাম। 🙂

আপনার কত খরচ হতে পারে সেই হিসেবে টাকা ডলার এনডোর্স করে নিতে হবে। অথবা ডাউকি থেকে টাকাও রুপি করে নেয়া যায়। আর ডলার নিলে ডাউকি বাজারে খুব কম রেট দেয়। ডলার ভাংগাতে পারবেন শিলং এ স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া অথবা পুলিশ বাজারের মানি এক্সচেঞ্জ থেকে। সবাই একই রকম রেট দেয়। ডলার এক্সচেঞ্জ করলে রশীদ যত্ন করে রাখুন। অনেক সময় ইমিগ্রেশনে দেখতে চাইতে পারে।

আর একটা ব্যপার হল, যদি ডোলার নেন তাহলে শিলং ছাড়া ভাল রেটে রুপিতে চেঞ্জ করতে পারবেন না। তাই চাইলে দেশে থেকেও কিছু রুপি নিয়ে যেতে পারেন যাতে করে ডলার ভাঙ্গানোর আগ পর্যন্ত খরচ চালিয়ে নিতে পারেন।

তবে মনে রাখবেন ইন্ডিয়ান রুপি ইন্ডিয়ার বাইরে নেয়া ও বাইরে থেকে নিয়ে ইন্ডিয়ায় ঢুকা অবৈধ।

ভ্রমনের উপযুক্ত সময়

শিলং ও চেরাপুঞ্জির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এখানে প্রচুর বৃষ্টি হয়। আর একারণেই বর্ষার সিজনই উপযুক্ত সময় মেঘালয়ে বেড়াতে যাওয়ার। তাই মে থেকে অক্টোবরই ভাল সময়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এখানে প্রচুর শীত পড়ে (৫-১৫ ডিগ্রী মাত্র)। এখন আপনি আপনার সুবিধামত সময় বেছে নিন।

ভ্রমণসঙ্গী

ভারতের যেকোন জায়গায় বা দেশেও যেখানেই যাননা কেন সব জায়গায় নির্দিষ্ট সংখ্যক ভ্রমণসঙ্গী নির্বাচন করা খুবই জরুরি। আর সংখ্যা নির্বাচন করতে হয় উক্ত জায়গায় প্রাপ্ত গাড়ির উপর নির্ভর করে। মেঘালয়ে সাধারণত ছোট ট্যাক্সি (মারুতি সুজুকি) পাওয়া যায় যাতে ৪ জন বসা যায় আরামে। আর ৬ জন ও ৮-৯ জনের জন্য আছে বড় জিপ গাড়ি (টাটা সুমো)। তাই আপনি খরচ কমাতে এভাবে ভ্রমণসঙ্গী ঠিক করুন।

যদি বন্ধুরা বা পরিচিতদের নিয়ে ট্যুরে যান তাহলে তো ভালই। তবে তা সম্ভব না হলে বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ থেকে খুঁজে নিতে পারেন কাংখিত ভ্রমণসঙ্গী। আমি এমন একটা গ্রুপের সাথে গিয়েছিলাম। তবে এভাবে অনলাইন গ্রুপের সাথে গেলে অবশ্যই আগে অফলাইনে সাক্ষাৎ করে নিবেন। আর সবার সাথে আপনার পছন্দের মিল-অমিল দেখে নিন। আর ভ্রমণের পূর্বে সম্ভব হলে সবার পাসপোর্ট ও ভিসার ফটোকপি বা স্ক্যান কপি সবাই শেয়ার করে নিন। আর নিকটজন কাউকে দিয়ে রাখুন।

পোষাক

ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত পোষাক নির্বাচন করা খুবই জরুরি। তবে একটা জিনিস মনে রাখবেন এখানে আপনি বেড়াতে যাচ্ছেন না যে প্রতিদিনের জন্য ভাল ভাল পোষাক নিতে হবে। এখানে আপনি ঘুরতে যাচ্ছেন তাই, ভাল দেখতে পোষাকের চেয়ে আরামদায়ক ও ব্যাগে কম জায়গা লাগবে এমন পোষাক নিন। আর যথাসম্ভব ব্যাগপ্যাক ছোট রাখুন। এখন দেখে নিন কি কি বিষয় খেয়াল রাখবেন।

মেঘালয়ে খুব বৃষ্টি হয়। তাই অবশ্যই রেইনকোট আর ছাতা নিয়ে নিবেন।

স্পোর্টস জুতা নিতে পারেন। ভাল গ্রীপ আছে এমন ট্র্যাভেলিং/ট্রেকিং সু নিন। কারণ বেশিরভাগ ঝর্ণা ও লিভিং রুট ব্রিজগুলো দেখতে আপনাকে পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে হবে। এছাড়া এগুলোতে পানি ধরে না এবং দ্রুত শুকিয়ে যায়।ওখানে জুতা বৃষ্টিতে ও ঝর্ণার পানিতে ভিজবে। ওরা নিজেরা সবসময় জুতা পরে।

হালকা শীতের কাপড় নিবেন। রাতে অনেক শীত পরে। আপনি যখন যাবেন তখনকার তাপমাত্রা গুগল করে জেনে নিন ও সেইমত শীতের কাপড় নিন। মাফলার নিতে পারেন কারণ শরীরে শীত না লাগলেও অনেক সময় ওখাঙ্কার বাতাস খুব ঠান্ডা হওয়ার গলায় ও কানে শীত লাগবে।

আপনাকে দুই/তিনদিন ভিজতে হতে পারে। মানে উমগট নদী, ক্রাংসুরি ফল ও ডাবল ডেকার রুট ব্রিজে গোসল করতে পারবেন। তাই সেইমত গোসলের পোষাক নিন। এমন পোষাক নিন যেগুলো দ্রুত শুকায়।

প্যান্ট ও হাফ/থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট গুলো যদি প্যারাসুট কাপড়ের নিতে পারেন তাহলে সবচেয়ে ভাল হয়। কারণ এগুলো দ্রুত শুকায় ও ব্যাগে কম জায়গা লাগে।

অন্যান্য

এছাড়া আরো কিছু বিষয় খেয়াল রাখা উচিৎ।

  • পাসপোর্ট এর ডাটা পেইজ ও ভিসার কয়েকটা ফটোকপি দেশ থেকেই নিয়ে যান। হোটেল বুকিং বা সিম কেনায় কাজে লাগবে
  • চাইলে কয়েক কপি ছবিও নিতে পারেন। যদিও কোথাও লাগবে না।
  • মোবাইলে সম্পুর্ন মেঘালয়ের ম্যাপ অফলাইনে ডাউনলোড করে নিন। এতে আপনি ইন্টারনেট ছাড়াই শুধুমাত্র জিপিএস ব্যাবহার করে করে জায়গাগুলোতে চলাচল করতে পারবেন। ………
  • প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ নিতে পারেন। যেমন প্যারাসিটামল,মেট্রোনিডাজল, এসিডিটির যেকোন ওষুধ।
  • ত্বক সচেতন হলে ক্যাপ, হ্যাট বা সানস্ক্রিন।
  • খাবারের স্বাদ আপনার পছন্দ নাও হতে পারে, তাই সেরকম মানুষিক প্রস্ততি নিয়ে রাখুন।
  • এক্সট্রা ব্যাটারি বা পাওয়ার ব্যাংক ও নিয়ে যেতে পারেন।

 

পার্ট-২ (ভ্রমণপর্ব)

আপনি পার্ট-১ বা পুর্বপ্রস্তুতি সেরে ফেলেছেন। চলুন দেখে নেই মেঘালয়/শিলং ভ্রমণ গাইডের ২য় পর্ব বা ভ্রমণপর্ব।

দর্শনীয় স্থানসমুহ

প্রথমেই জেনে নেই মেঘালয়/শিলং এর দর্শনীয় স্থানগুলো। এখানে জায়গাগুলো এক এক দিনের প্যাকেজ হিসেবে দেয়া হল। আপনি আপানার মত সাজিয়ে নিতে পারেন আপনার প্ল্যান।

 

দিন ১ (ডাউকি)

নোহওয়েট লিভিং রুট ব্রিজ

মাউলিলং ভিলেজ

বোরহিল ঝর্ণা

উমক্রেম ঝর্ণা

স্নোনেংপেডেং ভিলেজ

উমগট রিভার

 

দিন ২ (ডাউকি)

ক্রাংসুরি ঝর্ণা

চেরাপুঞ্জি গমণ

 

দিন ৩ (চেরাপুঞ্জি)

ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ

মৌসিমাই কেভ

সেভেন সিস্টার্স ঝর্ণা

ইকো পার্ক

নুকায়কালী ফলস

 

দিন ৪ (শিলং শহর)

শিলং পিক

লেডি হায়াদ্রি পার্ক

ডন বস্কো মিউজিয়াম

উমিয়াম লেক

ক্যাথিড্রাল চার্চ

গলফ কোর্স

ওয়ার্ডস লেক

 

৫ম দিন

এদিন আসার সময় এলিফেন্ট ফলস দেখে আসুন। তা না চাইলে আগের দিনই এটা দেখে নিন। কিন্তু ডাউকি বর্ডারে ফিরে আসার পথে এইটা পড়ে।

 

যাতায়াত

এখানে যাতায়াত নিয়ে আলোচনা করব।

ঢাকা-সিলেট
প্রথমে ঢাকা থেকে যেকোন এসি/নন-এসি বাসে চলে যান সিলেট। নন-এসি বাসের ভাড়া ৪৭০ টাকা। বাসগুলো রাত ১০ টা থেকে ১২ টার মাঝে ছেড়ে যায় ও সকাল ৫:০০ থেকে ৬ টায় পৌছে যায়। আমাদের বাস রাত ১১:০০ টায় ফকিরাপুল থেকে ছেড়ে পৌছেছিল সকাল ৫:০৫ এ।

সিলেট-তামাবিল বর্ডার
সিলেট বাসস্ট্যান্ড থেকে জাফলং এর বাস যায়। আপনারা কদমতলি থেকে জাফলংগামী বাসে উঠে পড়ুন। সময় লাগবে দু ঘন্টার মত। ভাড়া ৬০ টাকা।

ডাউকি বর্ডার
এখান থেকে কেউ শিলং যেতে চাইলে লোকাল শেয়ারড ট্যাক্সি আছে। তবে আমরা সব জায়গায় রিজার্ভ ট্যাক্সিতে গিয়েছি বিধায় সেভাবেই বলছি সব।

ঘুরাঘুরির জন্য মেঘালয়ে আপনাদের লোকজনের উপর নির্ভর করে ট্যাক্সি নিতে পারেন। আমরা রিজার্ভ ট্যাক্সি নিয়েই ঘুরেছি সব দিন। এতে ব্যাগ ট্যাক্সিতে রেখে নিশ্চিন্তে ঘোরা যায়। ওরা সাধারণত সারাদিন লোকেশন ঘুরিয়ে আনতে ২৫০০-২৮০০ রুপি নেয় (সারাদিন)। আর কোথায় শুধু ড্রপ করে দিতে ১৫০০-১৮০০ নেয় (আধাদিন)। যেমন আমরা চেরাপুঞ্জি হোটেল থেকে আশেপাশের লোকেশন ঘুরে আবার হোটেলে ড্রপ করতে ২৫০০ রুপি নিয়েছিল। আবার আসার দিন শুধু এলিভেন্ট ফলস থেকে ডাউকি নামিয়ে দিতে ১৮০০ রুপি নিয়েছিল।

 

বর্ডার ইমিগ্রেশন

বাংলাদেশ পার্ট

ডাউকি বর্ডার ইমিগ্রেশন অন্যান্য বর্ডারের তুওলনার সহজ ও ভীড় কম। প্রথমেই ডান পাশের  ঘর থেকে ইমগ্রেশন সম্পন্ন করতে হবে। এ জন্য প্রথমেই লাইন ধরে পুলিশের নিকট থেকে একটা বহিরাগমন কার্ড/Departure Card সংগ্রহ করে পুরন করে নিন। কোন কিছু না বুঝলে পুলিশের বা অন্য কোন ট্রাভেলার থেকে হেল্প নিন। নিচে একটি ছবি দেয়া হল।

 

বহিরাগমন কার্ড/Departure Card
বহিরাগমন কার্ড/Departure Card

ছবি ক্রেডিটঃ http://sarc97.blogspot.com/

বহিরাগমন কার্ড/Departure Card পুরন হয়ে গেলে লাইনে দাঁড়িয়ে ভিতরে জমা দিন। খারাপ লাগলেও সত্যি যে, ওরা টাকা চাইবে ১০০। 🙁 আপনি একটু ঝামেলা এড়াতে চাইলেই না দিলেও পারবেন। তবে অনেকেই ঝামেলা এড়াতে দিয়ে দেয়। এখান থেকে একটা সিল মেরে দিবে ওরা।

তো ইমিগ্রেশন শেষ করে এখন আপনাকে রাস্তার বিপরীত পাশের কাস্টমস অভিসে গিয়ে এন্ট্রি করতে হবে। এখানে ভ্রমণ করের রশিদ জমা দিতে হবে। আপনার কাছে কোন ক্যামেরা, ল্যাপটপ বা অন্য কোন বড় ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র থাকলে এখানে এন্ট্রি করিয়ে নিন। এতে আসার সময় ঝামেলা হবে না। নাহলে ওরা এইগুলোকে নতুন হিসেবে ধরে ট্যাক্স চাইতে পারে।  এখান থেকেও একটা সিল দিবে ওরা।

কাস্টমস শেষ হলে এখন সামনের দিকে গেলেই বিজিবি/পুলিশ আপনার আরেকবার নাম এন্ট্রি করবে অদের খাতায়। ভূলে আবার কাস্টমস শেষ করেই ইন্ডিয়া ঢুকে যাবেন না।

ব্যাস এখন সব হয়ে গেল বর্ডার পার হোন।

 

ইন্ডিয়া পার্ট

বাংলাদেশ পার্টের কাজ শেষ হয়ে গেলে ইন্ডিয়া অংশে ঢুকতেই বিএসএফ আবার পাসপোর্ট চেক করে ভিতরে ঢুকতে দিবে। এখন একটু হাটলেই হাতের বাম দিলে ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস অফিস (একই বিল্ডিং-এ)।

এখানেও প্রথমে একটু ভিতরে ঢুকে অফিসারের রুমে পাসপোর্ট জমা দিয়ে আসুন। ও একটা Arrival Card নিয়ে আসুন ও যথাযথভাবে পূরণ করুন। একটু পর ডাকলে ভিতরে গিয়ে Arrival Card জমা দিন ও স্বাক্ষর করুন। ওরা এখান থেকে একটা সিল মেরে দিবে। Address in India ও Telephone Number এর ঘরে একটা হোটেলের ঠিকানা ও ফোন নাম্বার দিলেই হবে। নিচের ঘরে  নিছে একটা Arrival Card এর ছবি দিলাম।

Indian Arrival Card
Indian Arrival Card

 

 

এর পর ওই বিল্ডিং থেকে বেরোনের সময় হল কাস্টমস ওখানে কিছু চেক করে না। তবে ওদের খাতায় নাম ও অন্যান্য তথ্য লিখে রাখে ও আরেকটা সিল মেরে দেয়। সব শেষ হয়ে গেলে বর্ডার ইমিগ্রেশন শেষ। এখন আপনি ঘুরুন আপনার প্ল্যানমত।

India Gate at Dawki-Tamabil Border
India Gate at Dawki-Tamabil Border

ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস বাংলাদেশের তুলনায় আসা ও যাওয়া দুই ক্ষেত্রেই খুবই সহজ ও ঝামেলাহীন।

ভাষা

ভাষা নিয়ে কোন চিন্তা নেই। ট্যাক্সি ড্রাইভাররা বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, খাসিয় প্রায় সব ভাষায় জানে। তাই এদের সাথে আপনার পছন্দমত ভাষায় কথা বলতে পারেন।

ডাউকির লোকজন বাংলা জানে আমাদের মতই।

স্নোনেংপেডেং সবাই খাসি ভষায়ই বলে। বাংলা জানে না বেশি কেউ। তবে সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ হল ইংলিশ। আপনার আশ্চর্য লাগবে এরা ইংলিশ পারে কিভাবে।

চেরাপুঞ্জিতেও স্নোনেংপেডেং এর মত খাসি/ইংলিশ।

আর শিলিং এ আমি প্রায় সবাইকেই দেখেচি বাংলা জানে। কারণ এখানে আসামার অনেক লোক কাজ করে ও বেড়াতে আসে। সাথে ইংলিশ তো আছেই।

আপনি যেকোন ভাষাই ব্যাবহার করতে পারেন। আর দু একবার বাইরে ঘুরতে গিয়ে নতুন একটা ভাষাতে আপনার দক্ষতাও ঝালিয়ে নিতে পারেন বাংলা বাদ দিয়ে। 🙂

 

সিম ও ইন্টারনেট

মেঘালয়ের যেকোন জায়গা থেকে সিম কেনা ঝামেলার ব্যপার। সাধারণত নতুন সিম এক্টিভ হতে কয়েক দিন সময় নিবে। আর ততদিনে আপনার ট্যুর শেষ হয়ে যাবে। তাই সিম কিনে লাভ নেই। তবে আপনি কারো থেকে প্রি-এক্টিভ সিম ৫০০-৬০০ রুপি দিয়ে কিনতে পারেন যদি পান।

তবে মেইন বিষয় হল নেটওয়ার্ক। আমি দেশ থেকে এক ভাইয়ের থেকে ভোডাফোন সিম নিয়ে গিয়েছিলাম। ডাউকি/স্নোনেগপেডেং এরিয়ায় কোন নেটোয়ার্ক নেই। চেরাপুঞ্জিতে থ্রিজি-ফোরজি পায়। তাও শুধু মেইন সিটিতে। আর শিলঙ্গএও মেইন শহরে থ্রিজি-ফোরজি পায়। তবে আইডিয়া-রিলায়েন্সে কভারেজ আরেকটু ভাল মনে হল এই দিকে। তাই আপনি পারলে দেশে থেকেই সিম নিয়ে যেতে পারেন। না হলে সিম কিনে লাভ নেই বেশি একটা।

এছাড়া ডাউকি, স্নোনেংপেডেং এরিয়াতে আপনি মাঝে মাঝে দেশি সব অপারেটরের নেটই পাবেন।  তাই মাত্র মাঝের দুদিন, মানে চেরাপুঞ্জি ও শিলং বাদে প্রায় সবদিনই নেট পাচ্ছেন। আর শিলং এ আপনি তো ওয়াইফাই পাচ্ছেনই।

 

হোটেল

স্নোনেংপেডেং

স্নোনেংপেডেং এ হোটেল/কটেজ একটু কম তাই একটু দেরিতে পৌঁছালে থাকার জায়গা নাও পেতে পারেন। আমরা কয়েকটা গ্রুপকে থাকার জায়গা না পেয়ে সন্ধ্যায় শিলং চলে যেতে দেখেছি। তাই একটু আগে গিয়ে নিজেরা হোটেল/কটেজ ঠিক করে নিন। আমরা মাত্র ১০০০ রুপিতে একটা ঘর পাই যেটাতে দুই বেডে চারজন ছিলাম। বাথরুম পাশেই বাইরে ছিল। পানি সব সময় ছিল না। যদিও আমরা গোসল করেছি পাশের উমগট নদীতে। স্নোনেংপেডেং এর কোন হোটেলে ওয়াইফাই নেই।

এছাড়া আপনি এডভেঞ্চার প্রিয় হলে উমগট নদীর তীরে তাবুতেও থাকতে পারেন ও ক্যাম্পিং করেতে পারেন।

চেরাপুঞ্জি

চেরাপুঞ্জিতে চারজনের রুম পড়েছিল ২০০০ রুপি।  Lyngdoh Mawphlang Homestay

চেরাপুঞ্জির এর কোন হোটেলেও ওয়াইফাই নেই।

শিলং

শিলং এ চারজনের রুম পড়েছিল ২৫০০ রুপি । ওয়াইফাই ছিল তবে রুমে ভাল কভারেজ ছিল না। তাই শিলং এ হোটেল নিলে আগে ওয়াইফাই দেখে নিন। শিলং এ সব হোটেলে বাংলাদেশিদের থাকতে দেয় না। তাই রুম পেতে একটু কষ্ট হতে পারে। আসলে বাজেট হোটেল পেতেই একটু বেশি ঝামেলা।

Hotel Assembly

 

খাবার

শিলং বাদে প্রায় সব জায়গায়ই গ্রামের মত। তাই খুব ভাল সুযোগ সুবিধা নেই। শিলং বাদে সব জায়গাতেই আগেই খাবার ওর্ডার করে দিতে হবে, তা না হলে খাবার পাওয়া যাবে না। সব জায়গায় মুরগী, ডিম ভাত, নুডলস, পরোটা পাবেন। আর হাটার পথে চা, পানি, রুটি, বিস্কুট, ডিম ইত্যাদি পাবেন।

আর শিলং এ পুলিশ বাজার জামে মসজিদের পাশে হোটেল সাভেরাতে পাবেন গরুর মাংস।  এছাড়া শিলং এ ভাল রেস্টুরেন্ট পাবেন যেখানে অনেক খাবার আইটেমম পাবেন। শিলং-এ KFC, Subway, Domino’s  ও পাবেন। এছাড়া শিলং এ বিভিন্ন স্ট্রিট ফুড।

প্রতিবেলা সাধারণত ১০০-১৫০ রুপি পড়বে

সতর্কতাঃ রাস্তার পাশে বা রেস্টুরেন্টে কিন্তু অনেক পর্ক বা শূকরের মাংসের আইটেম আছে। তাই দেখে খাবার ওর্ডার করুন ও খান।

গুগল ম্যাপ লোকেশনঃ

Hotel Savera (Muslim Dishes)

Domino’s Pizza

KFC Restaurant

Subway

 

শপিং

শপিং করার জন্য শিলং কে আমার খুব ভাল জায়গা মনে হয়নি। এখানে অনেক ব্র্যান্ড শপ আছে যেমন Adidas, Reebok, Puma, Nike, Fastrack, Woodland, Jockey  ইত্যাদি। একটা ৩-৪ তলা সুপার সপ আছে Vishal Mega Mart

নুকায়কালী ফলস এর পাশে থেকে খাঁটি মধু কিনতে পারেন। এছাড়া আছে অনেক ধরণের মসলা।

 

আসার সময় বর্ডার ইমিগ্রেশন

আসার সময় ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া যাওয়ার সময়ের বিপরীত।

ইন্ডিয়া পার্ট

প্রথমেই সেই ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন অফিসারের রুমে গিয়ে স্বাক্ষর করে সিল নিয়ে আসুন। এরপর কাস্টমস এ গিয়ে স্বাক্ষর ও সিল নিন। এখানে ওরা যেক করে না। জাস্ট নিজেরাই ব্যাগে দাগ দিয়ে দিল আমাদের। বলল দাগ না দিলে আবার বলবে চেক করি নাই। 🙂

বাংলাদেশ পার্ট

প্রথমে কাস্টমস এ গিয়ে পাসপোর্ট জমা দিন। এরপর আপনাকে ডাকলে ভিতরে যান, জিজ্ঞেস করবে ব্যাগ কয়টা ও তারপর ব্যাগ চেক করবে। ও জিজ্ঞেস করবে কোন ইলেক্ট্রনিক্স কিনেছেন কিনা। বা চেক করবে কি কি শপিং করেছেন। এইতো কোন ঝামেলা না থাকলে সিল ছেড়ে দিবে।

এরপর ইমিগ্রেশনে গিয়ে পাসপোর্ট জমা দিন ও স্বাক্ষর করে সিল নিয়ে বেড়িয়ে আসুন। এখানে আর কিছু জিজ্ঞেস করবে না।

 

খেয়াল করে ইন্ডিয়া থেকে এক্সিট ও বাংলাদেশে এন্ট্রি সিল পাসপোর্টে আছে কিনা চেক করে নিন।

 

টিপস ও অন্যান্য গুরত্বপুর্ন বিষয়াদি

  • শিলং এ অবশ্যই সকালের নাস্তায় আলু পরোটা মমো টেস্ট করে দেখবেন। ভাল লাগবে। মমো ভেজিটেবল ও চিকেন দুই অপশনই আছে।
  • যেখানেই ঘুরতে যান কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ যেমন – প্যারাসিটামল, মেট্রোনিডাজল, এসিডিটির ওষুধসহ আপনার লাগতে পারে এমন ওষুধ নিন।
  • সাথে করে পানি রাখুন ও বেশি বেশি পানি খান।
  • যথাসম্ভব নিজেরাই হোটেল ঠিক করুন। ড্রাইভাররা কমিশন নিতে পারে।
  • ফুটপাত থেকে কিনলে ঢাকার মতই দামাদামি করে কিনুন 🙂
  • সবখানেই প্রচুর মেয়েরা কাজ করে। তাই তাদের সম্মান করুন ও ভদ্রতা বজায় রাখুন
  • মানুষজন হেল্পফুল । কিছু জানতা চাইতে পারেন
  • কোন জায়গায়ই গাইড লাগে না। তবে ড্রাইভার গাইড নিতে বলতে পারে। সব জায়গায়ই মানুষ যেতে যেতা রাস্তা ক্লিয়ার হয়ে গেছে। এমনিই চিনবেন সব।
  • প্রায় সব জায়গাতেই এন্ট্রি ফি আছে ও ক্যামেরার জন্য এন্ট্রি ফি লাগে।

 

 

আমি আমার মেমরি থেকে যত সম্ভব লিখার চেষ্টা করেছি। কোন ভুল হতেও পারে। আশা করি এই গাইডটি আপনাদের শিলং ভ্রমণে সাহায্য করবে। আপনার কাছে কোন আপডেট তথ্য থাকলে জানান আমি যথাসম্ভব ক্রেডিট দিয়ে এই গাইড আপডেট করব। এতে অন্য ট্রাভেলারদের উপকার হবে। আপনি ভ্রমণ করে সে জানানা। বিশেষ করে ট্যাক্সি ভাড়া খুব পরিবর্তন হয়। তাই এসে আমাকে কমেন্টে জানালে খুশি হব।

আর কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে জানান। আমি যথাসম্ভব দ্রুত উত্তর দিতে চেষ্টা করব।  Happy Travelling 🙂

লেখক সম্পর্কে

Freelance Internet Researcher & Lead Generation Specialist at

ভালো লাগে নিত্য-নতুন বিষয় সম্পর্কে জানতে। লিখতে অনেক ইচ্ছে হয় কিন্তু সময় বের করে লিখতে পারি না। আর কিছু লিখতে পারলে অনেক ভালো লাগে। ২০১৩ সাল থেকে ফ্রিল্যান্স ইন্টারনেট রিসার্চার ও সেলস এসোসিয়েট হিসেবে কাজ করছি আপওয়ার্কে। বর্তমানে বি.এসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মন নেই, পড়তে হচ্ছে বলে পড়ছি। ক্যারিয়ারে নিজের মত করে কিছু করতে মন চায়। ভ্রমনের প্রতি আকর্ষন তীব্র আমার।

Facebook Comments

Saiful Islam Sohel

ভালো লাগে নিত্য-নতুন বিষয় সম্পর্কে জানতে। লিখতে অনেক ইচ্ছে হয় কিন্তু সময় বের করে লিখতে পারি না। আর কিছু লিখতে পারলে অনেক ভালো লাগে। ২০১৩ সাল থেকে ফ্রিল্যান্স ইন্টারনেট রিসার্চার ও সেলস এসোসিয়েট হিসেবে কাজ করছি আপওয়ার্কে। বর্তমানে বি.এসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মন নেই, পড়তে হচ্ছে বলে পড়ছি। ক্যারিয়ারে নিজের মত করে কিছু করতে মন চায়। ভ্রমনের প্রতি আকর্ষন তীব্র আমার।

One thought to “শিলং ভ্রমণ গাইড বিস্তারিত খরচ ও অন্যান্য তথ্য”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.